Looking For Anything Specific?

Header Ads

বিতর্কের মঞ্চ থেকে ব্ল্যাক হোল, অত:পর মস্তিষ্কের রহস্য অনুসন্ধানে


১৯৯৩-৯৪ সালের বাংলাদেশ। বিটিভির স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা তখন বেশ আলোচিত একটি আয়োজন। আজকের মতো হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না, ইউটিউব ছিল না, ফেসবুকও ছিল না। ছিল টেলিভিশনের পর্দা, আর ছিল কিছু অসাধারণ কিশোর-কিশোরী, যারা শুধু কথা বলত না, যুক্তি দিয়ে কথা বলতে জানত। সময়ের ব্যবধানে সেই বিতর্কের বিভিন্ন ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পরে সেগুলো দেখেছে, মুগ্ধ হয়েছে। সেই বিতর্কে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই ছিলেন নিজ নিজ জায়গায় অসাধারণ। তবে একজনকে আলাদা করে মনে রাখার মতো। কথা বলার ধরন, যুক্তি সাজানোর ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস আর সাবলীল উপস্থাপনা ছিল সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। মাঝেমধ্যে মনে হতো, মেয়েটি এখন কোথায়? কী করছেন?

উত্তরটা জানার পর সত্যিই একটু থমকে যেতে হয়। তার নাম রেবেকা শাফি। ঢাকার ধানমন্ডিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শিক্ষিত এক পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। তার বাবা ও মা দুজনেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ও’ ও ‘এ’ লেভেলও সম্পন্ন করেন রেবেকা। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

সেখানে বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা ক্যালটেকে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। স্নাতক পর্যায়ে ৪-এর মধ্যে ৪.০০ সিজিপিএ অর্জন করেন। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি। গবেষণার বিষয় ছিল মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় বিষয় ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। ব্ল্যাক হোল কত দ্রুত ঘোরে, তা পরিমাপের মতো জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।

এখানেই যদি গল্পটা শেষ হতো, তাহলেও এটি একজন অসাধারণ মেধাবী বাংলাদেশির গল্প হতো। কিন্তু রেবেকা থামেননি। পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশ নিয়ে গবেষণার পর একসময় বদলে ফেলেছেন গবেষণার ক্ষেত্র। এবার প্রবেশ করেছেন মানুষের মস্তিষ্ক ও জেনেটিক্সের জগতে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। মানুষের মস্তিষ্কের গঠন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও তার গবেষণার অন্যতম বিষয়।

একবার পুরো যাত্রাটা পাশাপাশি রাখুন। বিটিভির স্কুল বিতর্কের মঞ্চ থেকে ক্যালটেকে পদার্থবিজ্ঞান, সেখান থেকে হার্ভার্ডে ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা, আর এখন মানুষের মস্তিষ্ক ও জেনেটিক্স নিয়ে কাজ। গবেষণার বিষয় বদলেছে, বদলেছে জ্ঞানের জগৎ; কিন্তু বদলায়নি অজানাকে জানার কৌতূহল। সম্ভবত এটাই প্রকৃত প্রতিভার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। নিজেকে কোনো একটি গণ্ডিতে আটকে না রেখে নতুন প্রশ্নের পেছনে ছুটে চলা।

রেবেকা শাফির গল্প শুনে আমরা খুব সহজেই গর্বিত হতে পারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখতে পারি, ‘বাংলাদেশের মেয়ে, আমাদের গর্ব।’ কয়েকটি লাল-সবুজ ইমোজিও যোগ করতে পারি। তারপর পরের পোস্টে চলে যেতে পারি। কিন্তু একটু থামা দরকার। কারণ রেবেকা শাফির গল্প শুধু গর্ব করার গল্প নয়, আমাদের অস্বস্তিতে ফেলার মতোও একটি গল্প।

একজন মেধাবী মানুষকে আমরা তৈরি করেছি, নাকি তার পরিবার তাকে তৈরি করেছে, নাকি সে নিজেই নিজের পথ তৈরি করেছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাকে ধরে রাখার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলাম? মেধার গল্প শুনতে আমাদের ভালো লাগে, কিন্তু মেধাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে আমরা কতটা আগ্রহী?

আমরা চাই বাংলাদেশের সন্তানরা বিশ্বমানের বিজ্ঞানী হোক, গবেষক হোক, শিক্ষক হোক। কিন্তু সেই গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ কতটা আছে? পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ আছে? আধুনিক ল্যাবরেটরি আছে? তরুণ গবেষকদের নতুন কিছু করার স্বাধীনতা আছে? ব্যর্থ হওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে? নাকি এখনও আমাদের কাছে মেধার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বর?

কেউ বিদেশে গেলে তাকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। জ্ঞান ও গবেষণার কোনো সীমান্ত নেই। একজন মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে গিয়ে কাজ করতে পারেন। রেবেকা শাফিও সেটিই করেছেন। তার সাফল্য বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয় হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নটাও থেকে যায়, একজন রেবেকা শাফি যদি বাংলাদেশে থেকেই বিশ্বমানের গবেষণা করার সুযোগ পেতেন, তাহলে কেমন হতো?

আরও বড় প্রশ্ন, আমাদের চারপাশে কি আরও অনেক রেবেকা শাফি আছেন, যারা সুযোগের অভাবে নিজেদের সম্ভাবনাটুকুও আবিষ্কার করতে পারছেন না?

সমস্যাটা কি আমাদের মেধায়, নাকি মেধাকে বিকশিত করার পরিবেশে? মেধাবীরা দেশ ছাড়ছে কেন, সেটি নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। কিন্তু মেধাবীদের দেশে থাকার মতো পরিবেশ তৈরি করতে কী করছি, সেই প্রশ্নটি কি যথেষ্ট জোরে করি?

রেবেকা শাফির গল্প তাই শুধু একজন সফল মানুষের গল্প নয়। এটি আমাদের শিক্ষা, গবেষণা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে রাখা একটি আয়না। সেখানে তাকালে হয়তো নিজের চেহারাটাই দেখা যাবে।

আমরা কি শুধু মেধাবীদের সাফল্যে গর্ব করতে চাই, নাকি এমন একটি দেশও তৈরি করতে চাই, যেখানে একজন মেধাবী মানুষ তার স্বপ্নের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন?

রেবেকা শাফি সেই প্রশ্নের উত্তর নন। বরং তিনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ